fbpx

বিটকয়েন, ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থা

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম একটি আলোচিত বিষয় চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যা IR 4.0 নামেও পরিচিত। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য উপাদান সমুহ হচ্ছে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অফ থিংস, রোবোটিক্স, ব্লকচেইন প্রযুক্তি ইত্যাদি। বর্তমান বিশ্বায়ন এর এই যুগের সাথে তাল মিলাতে হলে এইসব উপাদান সমুহের যৌক্তিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরী। সোনালী ব্যাংক লিমিটেড শুরু থেকেই একটি প্রযুক্তিবান্ধব ব্যাংক, বর্তমান সময়কালে এর ব্যবহার বিশেষভাবে বিকশিত হয়েছে। Sonali e-Sheba, Sonali e-Wallet, Sanchay Sheba, Sonali Payment Gateway etc. এইসব প্রোডাক্ট গুলো এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তাছাড়া ব্যাংকের গ্রাহকগণ এইসব প্রোডাক্ট গুলো কে ইতিবাচক দৃষ্টি তে গ্রহণ করছে যা একটি ভালো দিক।

ই-মুদ্রা কী?

পৃথিবীর আদিকাল থেকে লেনদেন এর মাধ্যম হিসেবে মুদ্রার ব্যবহার হয়ে আসছে। কালের বিবর্তনে মুদ্রার রুপ বিভিন্ন ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। স্বর্ণ মুদ্রা, রৌপ্য মুদ্রা, তাম্র মুদ্রা, কাগুজে মুদ্রা ইত্যাদি এর উদাহরণ। বর্তমান বিশ্বে নতুন এক মুদ্রার আবির্ভাব হয়েছে যার নাম ই-মুদ্রা। ই-মুদ্রা বলতে সাধারণত ইলেক্ট্রনিক মুদ্রা বা ডিজিটাল মুদ্রা কে বুঝায়। কাগজের বা অন্যান্য মুদ্রার সাথে এর প্রধান পার্থক্য হচ্ছে ই-মুদ্রা চোখে দেখা বা স্পর্শ করা যায় না তবে এর অস্তিত্ব আছে। ই-মুদ্রার একটি ধরণ হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। এটি এমন একটি মুদ্রা যার কোন কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নেই। সহজ কথায় বলতে গেলে আমরা যখন কোন লেনদেন করি তখন এর কেন্দ্রে মাধ্যম হিসেবে কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কাজ করে। কি$ ক্রিপ্টোকারেন্সি এর মাধ্যমে দুইজন ব্যবহারকারী কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর সাহায্য ছাড়াই সরাসরি তাদের মধ্যে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারেন।

বর্তমানে কয়েকটি জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি হচ্ছে-

  • Bitcoin (BTC)
  • Ethereum (ETH)
  • Binance Coin (BNB)
  • Tether (USDT)
  • Cardano (ADA)

যদিও এখনো বেশিরভাগ দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি এর ব্যবহার বৈধ নয় তবুও সময়ের সাথে সাথে এই মুদ্রা গুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এদের মধ্যে বিটকয়েন সর্বাধিক জনপ্রিয়।  Tesla, Microsoft, PayPal এদের মত বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো বিটকয়েন সরাসরি গ্রহণ করেছে।

বিটকয়েন এর ইতিহাস

বিটকয়েন বিশ্বের প্রথম ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোকারেন্সি। এটি একটি বিকেন্দ্রিক ই-মুদ্রা যা কোন দেশের সরকার দ্বারা ইস্যুকৃত নয়। ২০০৮ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান এই মুদ্রার একটি শ্বেত পত্র প্রকাশের মাধ্যমে এর প্রচলন শুরু হয়। এটি একটি পিয়ার টু পিয়ার মুদ্রা অর্থাৎ এর লেনদেন এর জন্য কোন কেন্দ্রীয় মাধ্যমের প্রয়োজন নেই। এই মুদ্রার ব্যবহার পুরোপুরি ব্লকচেইন প্রযুক্তি এর উপর দাড় করানো। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ছাড়া বিটকয়েন এর কোন অস্তিত্ব নেই। বিটকয়েনের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে।

ব্লকচেইন প্রযুক্তি

ব্লকচেইন প্রযুক্তি একটি বিকেন্দ্রিক নেটওয়ার্ক সিস্টেম যাতে একটি চেইন বা শিকল এর মাধ্যমে অসংখ্য কম্পিউটার যুক্ত থাকে যাদের প্রত্যেকের কাছে একই ডাটা কপি করা থাকে। খুব সহজভাবে বলতে গেলে ব্লকচেইন দ্বারা এক বিশেষ ধরনের ডাটাবেজ কে বুঝায়। এটি এমন একটি ডাটাবেজ যার উপর কোন কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, এর কোন ডাটা পরিবর্তন বা ডিলিট করা যাবে না। এই ডাটাবেজে একই নেটওয়ার্কে যারা থাকবে সবার কাছে একই ডাটা কপি থাকবে এবং নেটওয়ার্কের সবাই সেই একই ডাটাবেজ ম্যানেজ করবে। এখানে যদি কেউ চেঞ্জ করতে চায় তাহলে ওই নেটওয়ার্কের সবাইকে একমত হতে হবে। এখানে ডাটা মানে আসলে ব্লক কে বোঝানো হয়েছে। প্রতিটি ব্লক এ একটা হেড অংশ থাকবে। হেড অংশের মধ্যে প্রিভিয়াস ব্লকের অ্যাড্রেস থাকবে এবং সাথে কারেন্ট ব্লকের ডাটা থাকবে। এরকম অনেকগুলো ব্লক মিলে আসলে একটা চেইন তৈরি হয়।

অর্থাৎ একটি ব্লক এ সাধারণত তিনটি অংশ থাকে, যেমনঃ

১। নেটওয়ার্ক এর অভ্যন্তরের সংঘটিত একটি লেনদেনের সময়, তারিখ এবং মুদ্রার পরিমাণ।

২। যারা লেনদেন করবেন তাদের ডিজিটাল সিগনেচার; ডিজিটাল সিগনেচার হচ্ছে এমন একটি ইউনিক কোড যা কিনা লেনদেন এর সময় অটো জেনারেট হবে।

৩। হ্যাশ নামে একটি ইউনিক কোড থাকবে যা কিনা একটি ব্লক কে আরেকটি ব্লক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখবে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত কবিতার পঙক্তি “আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে” যার সাথে ব্লকচেইন প্রযুক্তির কিছুটা মিল আছে। কেননা ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে নেটওয়ার্ক এর অভ্যন্তরের সকল ব্লক এর ক্ষমতা সমান। এখানে কেন্দ্রীয় বা একা কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার উপায় নেই। তাই ব্লকচেইন প্রযুক্তি এর সব থেকে ভালো দিক হচ্ছে এর সিকিউরিটি। যখন একটি লেনদেন অথবা তথ্য আদান প্রদান হবে তখন নেটওয়ার্ক এ অভ্যন্তরের সকল কম্পিউটার তা পর্যবেক্ষণ করার পর যদি তারা এটিকে বৈধ ঘোষণা করে তখনি কেবল লেনদেন টি সম্পন্ন হবে।

ব্লকচেইন প্রযুক্তি যেসব কাজে ব্যবহার হতে পারেঃ

১। পেমেন্ট প্রসেসিং এবং মানি ট্রান্সফারের এর জন্য এটি সময় এবং অর্থ দুটোই বাঁচাতে পারে।

২। সাপ্লাই চেন ব্যবস্থাপনার কাজে এটি ব্যবহার হতে পারে। ভারতের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান বাজাজ ইলেক্ট্রিকালস তাদের কাঁচামাল সরবরাহকারীদের পেমেন্ট এর জন্য ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে।

৩। ডিজিটাল ভোটিং এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে।

৪। ডিজিটাল আইডি এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে। যেহেতু ব্লকচেইন এ ডিজিটাল সিগনেচার নামক ইউনিক কোড থাকে সেহেতু এই ডাটা হ্যাক হওয়া প্রায় অসম্ভব।

৫। মেডিকেলের রোগীর তথ্য সংরক্ষণে এটি খুব ভাল একটি দিক হতে পারে।

অর্থাৎ ব্লকচেইন প্রযুক্তি কেবল অর্থ আদান প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে এই প্রযুক্তি ব্যবহার হতে পারে।

বিটকয়েন মাইনিং বা বিটকয়েন কিভাবে উৎপন্ন হয়?

২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েন এর সোর্সকোড উন্মুক্ত করে নেটওয়ার্ক সম্প্রচার চালু করেন এবং তিনিই প্রথম বিটকয়েনটি মাইন করেন। এখন মূল কথা হচ্ছে, বিটকয়েনটি কিভাবে উৎপন্ন হলো? একটি নেটওয়ার্ক এর অভ্যন্তরের কোন ইউজার বা প্রেরক যদি অন্য কোন ইউজার কে কোন বিটকয়েন পাঠাতে চায় তাহলে একটি পাবলিক লেজার তৈরি হয়। সেই পাবলিক লেজারটিতে কে কাকে কত বিটকয়েন পাঠাবে সেই তথ্য থাকে।

এখন আমরা একটু আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে ফিরে আসি; ব্যাংক থেকে যখন কেউ চেক টাকা তুলতে আসে তখন আমরা চেক ডেবিট করার আগে ব্যক্তিকে চেহারা বা সাক্ষরের মাধমে শনাক্ত করি, তারপর যদি টাকার পরিমাণ পর্যাপ্ত হয় তখন গ্রাহককে টাকা প্রদান করা হয়। এখন বিটকয়েন এর ক্ষেত্রে যখন প্রেরক কাউকে বিটকয়েন পাঠায় তখন ২৫৬ বিটের একটি বিশাল ইউনিক কোড বা ডিজিটাল সিগনেচার তৈরি হয় যা কিনা পাবিক লেজারটতে থাকে। ঠিক একইভাবে প্রাপক এর এন্ড থেকেও সেইম ২৫৬ বিটের ডিজিটাল সিগনেচার তৈরি হয়। যখনই এই ডিজিটাল সিগনেচার দুইটি মিলে যায় তখনি লেনদেনটি সম্পন্ন হয়।

আর এই সিগনেচার মিলানোর কাজটি যারা করে থাকে তাদের বলা হয় বিটকয়েন মাইনারস। নেটওয়ার্ক এ অবস্থিত সকল মাইনারস যখন এই লেনদেনটি কে বৈধ বলে স্বীকার করে তখন সফলভাবে বিটকয়েন আদান প্রদান সম্পন্ন হয়। আর এই কাজের জন্য মাইনারস দের পুরস্কার হিসেবে তাদের ডিজিটাল ওয়ালেটে একটি নির্দিষ্ট বিটকয়েন পরিমাণ জমা হয়। অর্থাৎ একটি বিষয় পরিষ্কার যে, শুধুমাত্র নেটওয়ার্ক এ পূর্বে বিদ্যমান বিটকয়েন এর আদান প্রদান হলেই কেবলমাত্র নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়া সম্ভব।

২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো নিজেদের মধ্যে নিজেরাই বিটকয়েন আদান প্রদানের মাধ্যমে বিটকয়েন মাইনিং করতে থাকেন। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। প্রত্যেক চার বছর পর পর বিটকয়েনের মোট সংখ্যা পুনঃনির্ধারন করা হয় যাতে করে বাস্তব মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়। ২১৪০ সাল পর্যন্ত মোট ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরী হবে এবং পরবর্তীতে আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরী করা হবে না। দিন দিন বিটকয়েন মাইনার এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যেহেতু চাহিদা বাড়ছে এবং যোগান কমছে তাই সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বিটকয়েনের দাম বাড়ছে। বর্তমানে শেষ তথ্য অনুযায়ী এক বিটকয়েন এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৫৭ হাজার মার্কিন ডলার।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে বিটকয়েন লেনদেন এর সময় প্রেরক এবং প্রাপক এর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকে অর্থাৎ কোন ব্যক্তি কাকে বিটকয়েন পাঠাচ্ছে তা বোঝার কোন উপায় নেই। বিটকয়েন ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগিন করার পর তারা তাদের লেনদেন সম্পন্ন করতে পারেন।

বিটকয়েন মাইনার এর মাধ্যমে যে কেউ বিটকয়েন উৎপন্ন করতে পারে। মাইনাররা তাদের ডিভাইস সমূহ এর কম্পিউটিং পাওয়ার ব্যবহার করে বিটকয়েন মাইন করে থাকে। আমাদের মোবাইল ফোন কিংবা ব্যক্তিগত কম্পিউটার দিয়েও বিটকয়েন মাইনিং সম্ভব। তবে ইতিমধ্যে ১৮.৮৭ মিলিয়ন বিটকয়েন মাইন হয়ে গেছে, তাই এখন বিটকয়েন মাইনিং করতে অনেক শক্তিশালী কম্পিউটিং মেশিন প্রয়োজন। GPU, Antminer S19, Antminer S19 Pro, WhatsMiner M30s+, ASIC etc.এইসব শক্তিশালী এবং ব্যয়বহুল ডিভাইস গুলো দিয়ে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বিরতিহীন ভাবে বিটকয়েন মাইনিং হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির সম্ভাবনা

১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট এর আবিষ্কার যেমন এক বিপ্লবের সূচনা করেছিল ঠিক তেমনি অনেক প্রযুক্তিবিদ এর মতে, ব্লকচেইন ভবিষ্যতে এমনি এক বিপ্লবের সূচনা করতে চলেছে। ব্লকচেইন মানেই যে শুধু বিটকয়েন নয় কিš‘ নয়। বিটকয়েন শুধুই একটি ডিজিটাল মুদ্রা যা কিনা ব্লকচেইন প্রযুক্তি কে ঘিরে তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং যেসব খাতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি সম্ভাবনার আলো হতে পারে তা নিচে আলোচনা করা হলোঃ

১। পেমেন্ট সিস্টেমঃ ব্লকচেইন এ যেহেতু বিকেন্দ্রীক লেজার প্রযুক্তি (DLT) ব্যবহার করা হয়েছে তাই এর মাধ্যমে খুব কম সময় এবং খরচে পেমেন্ট করা যাবে।

২। KYCt: গ্রাহক এর সকল তথ্য বিকেন্দ্রীক ব্লকে থাকায় তা খুবই সুরক্ষিত থাকে। তাছাড়া KYC এর পিছনে প্রতি বছর ব্যাংক এর একটা বিরাট খরচ হয় যা কিনা ব্লকচেইন প্রযুক্তি বাচাতে পারে।

৩। ঋণঃ ব্লকচেইন ব্যবহার করে ঋণ গ্রহণ এবং আদায় কে আরও গতিশীল করে তোলা যাবে। বিকেন্দ্রীক লেজার প্রযুক্তি (DLT) ব্যবহার করে ঋণ খাতকে আরেকটি নতুন মাত্রা দেয়া যেতে পারে।

৪। সুরক্ষাঃ যেহেতু ব্লকচেইন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় কোন নিয়ন্ত্রণ নেই এবং নেটওয়ার্ক এর অভ্যন্তরের কোন তথ্য পরিবর্তন কারও একার পক্ষে সম্ভব নয় তাই এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সুরক্ষিত।

৫। জালজালিয়াতিঃ যেহেতু ব্লকচেইন এ কেউ লেনদেন করলে ব্লক এর অভ্যন্তরের সকল ইউজার তা যদি বৈধ বলে তখনই লেনদেন হয় যেহেতু এখানে কেউ চাইলেই জালজালিয়াতি করা সম্ভব নয়।

৬। রেমিট্যান্সঃ ব্লকচেইন ব্যবহার যেহেতু বিশ্বের সকল দেশের ইউজার থাকতে পারে তাই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রেমিট্যান্স খাতকে আরও সমৃদ্ধশালী করা যেতে পারে।

৭। সময় এবং অর্থঃ ব্লকচেইন ব্যবস্থায় খুব দ্রুত ব্যাংকিং লেনদেন করা সম্ভব। তাছাড়া আলাদা কোন প্রসেসিং ফি না থাকায় এটি ব্যাঙ্কের অনেক টাকা বাঁচাতে সক্ষম।

৮। বিনিয়োগ এবং ফান্ডিংঃ বিনিয়োগ এবং ফান্ডিং এর জন্য ব্লকচেইন একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।

৯। আইডেন্টিফিকেশনঃ ব্যাংকিং খাতে কাস্টমার আইডি ভেরিফিভিকেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ব্লকচেইন ব্যবস্থায় ক্রিপ্টগ্রাফিক এলগোরিদম দিয়ে আইডি সুরক্ষিত থাকে তাই কারো অর্থ নিয়ে প্রতারণা করা সহজ নয়।

বিশ্বের অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার, সুরক্ষা, KYC প্রভৃতি সহ নানা কারনে ব্লকচেইন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। সুতরাং ব্লকচেইন প্রযুক্তি কে যদি যথাযথ ভাবে ব্যাংকিং খাতে ব্যবহার করা যায় তাহলে এটি অবশ্যই একটি ভালো পরিবর্তন আনতে সক্ষম। বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ৫, জানুয়ারী ২০২০ সালে National Blockchain Strategy: Bangladesh নামে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে যাতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি এর উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

বিটকয়েন এবং অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রার সুবিধাসমূহ

যদিও বিটকয়েন এবং অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে তবুও এর কিছু সুবিধা আছে। যেমনঃ

  • ডিজিটাল মুদ্রা কাগুজে টাকার মুদ্রণ খরচ বাঁচাতে পারে।
  • ব্যাংকের ভল্ট এর টাকা সংরক্ষণে টাকা এবং নিরাপত্তা উভয়ের প্রয়োজন হয় যা কিনা ডিজিটাল মুদ্রায় নেই।
  • ডিজিটাল মুদ্রায় জাল টাকার কোন অস্তিত্ব নেই।
  • ডিজিটাল মুদ্রা বহন করার কোন ঝামেলা এবং ঝুঁকি নেই।
  • কাগুজে মুদ্রার থেকে ডিজিটাল মুদ্রা অনেক সুরক্ষিত।

বিটকয়েন এবং অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রার ঝুঁকিসমূহ

বিটকয়েন এবং অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রা সমূহ এর প্রধান সমস্যা হচ্ছে একে কেন্দ্রীয় ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কোন উপায় নেই। যার কারনে নিচের সমস্যা গুলো উদ্বিগ্ন এর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেঃ

  • যেহেতু ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেন এর সময় লেনদেনকারীর পরিচয় গোপন থাকে তাই খুব সহজেই এর অপব্যবহার সম্ভব। সম্প্রতি অনেকে ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে বিভিন্ন ক্রাইম করে যাচ্ছে যাদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা কষ্টসাধ্য।
  • মাদক কেনা বেচায় ডিজিটাল মুদ্রার অপব্যবহার হচ্ছে।
  • ডিজিটাল মুদ্রায় কালোবাজারি ও অর্থ পাচারের আশঙ্কা রয়েছে।
  • ডিজিটাল মুদ্রা একটি নিয়ন্ত্রনহীণ মুদ্রা ব্যবহার উদাহরণসরূপ বিটকয়েন এর মূল্য ঊর্ধ্বগতি।
  • বিটকয়েন বা অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রা সমূহ যেভাবে মাইনিং করা হচ্ছে তা মোটেও পরিবেশবান্ধব নয়।
  • যেহেতু ডিজিটাল মুদ্রা সমূহ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না সেহেতু কোন নিয়ম নীতি ছাড়া এটির ব্যবহার অবশ্যই একটি ঝুঁকির ব্যাপার।

এসব ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ বিটকয়েন এবং অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রা সমূহ কে বৈধতা দেয়নি। তবে কিছু দেশ যেমনঃ ইকুয়েডর, চীন, জাপান, এস্তনিয়া, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশ ইতিমধ্যে তাদের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা চালু করেছে ।

বিটকয়েন এবং বাংলাদেশ

যদিও বাংলাদেশে খুব সীমিত আকারে বিটকয়েন কেনাবেচার কথা জানা যাচ্ছে, তবে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিটকয়েন বা অন্য কোন ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা বা সংরক্ষণ করা বেআইনি বলে জানাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বিটকয়েনে লেনদেনের ব্যাপারে সতর্কতা জানিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ভার্চুয়াল মুদ্রা কোন দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ ইস্যু করে না বিধায় এর বিপরীতে আর্থিক দাবির কোন স্বীকৃতিও নেই। ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের দ্বারা মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে দিয়েছে।

তবে ইতিমধ্যে যেহেতু অনেক দেশ তাদের নিজস্ব ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে ভাবছে সেহেতু আমাদের ও এটি নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন যাতে অন্যান্য দেশ থেকে আমরা পিছিয়ে না পড়ি। যদি একটি নির্দিষ্ট নিয়ম নীতিমালার মধ্যে দিয়ে ব্লকচেইন এবং ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় তাহলে এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

Leave a Reply

error: